শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বিরোধীদলের লং মার্চের কোনো যৌক্তিকতা নেই : রিজভী তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দীপ ৪ দিনের রিমান্ডে নেতানিয়াহুর আর সরকার গঠনের সুযোগ নেই : লাপিদ বিক্ষোভে নামছে পরিবর্তনের পক্ষের ইসরায়েলিরা ইউক্রেনের কাছে ৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিলো যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে হামের প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত ১ হাজার ৩৫০ ছাড়াল পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনা এখন ইরানি জনগণের দাবি: তেহরানের খতিব হেরে ফাইনালের স্বপ্নে ধাক্কা বাংলাদেশের রোনালদো ১৪, মেসি ২৭– দুজনকে ছাড়িয়ে গিল ১৩ সাফের দল ঘোষণা ভারতের হাকিমির হ্যাটট্রিকে পিএসজির গোল উৎসব পাস করা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ফাঁকা থাকবে ৭ লাখ সিট এইচএসসির ফলাফলে শীর্ষে ঢাকা, তলানিতে বরিশাল কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯.৪৩ এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, কোন বোর্ডে পাসের হার কত

তাহসিফের মৃত্যু: দীপের বক্তব্যে অসংগতি, তদন্তে নতুন তথ্য

অনলাইন ডেস্ক / ৩ জন দেখেছেন
আপডেট : October 30, 2026
তাহসিফের মৃত্যু: দীপের বক্তব্যে অসংগতি, তদন্তে নতুন তথ্য

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তি মাঠে কেন তারা গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে কোনো নারী বা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানাচ্ছেন না তিনি।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, দীপের দেওয়া কোনো বক্তব্যই যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা হচ্ছে না। তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে মাদক ও নারী সংশ্লিষ্টতার বিষয় এবং এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।

পিবিআই সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে দীপ দাবি করেন, তিনি ওই মাঠে যাননি; তাহসিফ তাকে সেখানে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে তদন্তকারীরা জানতে চান, মাঠে না গেলে মোটরসাইকেলটি কোথায় ছিল, তা তিনি কীভাবে জানলেন। জবাবে দীপ বক্তব্য পরিবর্তন করে জানান, তাহসিফ তাকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। আগে থেকে ওই স্থানটি তার পরিচিত ছিল না।

তবে সেখানে যাওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো পরিষ্কার করেননি দীপ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই মাঠে মাদক সেবনের ঘটনা ঘটে এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেও অভিযান চালিয়েছে। তাহসিফ ও দীপ মাদকসংক্রান্ত কোনো কারণে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই রাতে তাদের সঙ্গে একজন নারী ছিলেন বলেও তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তিনি শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, নাকি তার আগেই তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, তা যাচাই করা হচ্ছে।

তাহসিফের মৃত্যুর আগের রাতের গতিবিধি জানতে প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে পিবিআই। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর বাসা থেকে বের হয়ে তিনি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ওই রাতে দীপের সঙ্গে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার কথা হয় তাহসিফের। এ ছাড়া তার ফোনে আসা ও করা অন্যান্য কল এবং হোয়াটসঅ্যাপের বার্তাও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো মামলা না হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পিবিআইয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নিহতের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। সে ক্ষেত্রে পরিবারের মামলা না করার কারণও খতিয়ে দেখা হবে।

এদিকে শুক্রবার রাতে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে দীপের বাবা, ছোট ভাই ও মামাকে দেখা যায়। দীপের মামা জানান, পড়াশোনার সূত্রে তাহসিফ ও দীপের পরিচয় এবং সেখান থেকেই বন্ধুত্ব। তাহসিফ নিয়মিত দীপের মোহাম্মদপুরের বাসায় যাতায়াত করতেন। তবে তাহসিফের জানাজা ও দাফনে দীপ বা তার পরিবারের কেউ অংশ নেননি বলে জানান তিনি। কেন তারা যাননি, সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি দীপের মামা।

ময়নাতদন্তের নমুনা পরীক্ষায় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের সময় পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা, রক্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাহসিফ সাঁতার জানতেন কি না এবং পানিতে পড়ার সময় সাঁতারের সক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ছিল কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ এবং শরীরে মাদক বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি সম্পর্কে জানা যেতে পারে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার কথা রয়েছে।

পুলিশের মতো দুজনকে দেখে দৌড়ানোর দাবি দীপের
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতের ঘটনা সম্পর্কে দীপের নতুন বক্তব্যও পেয়েছে পিবিআই। তার দাবি, ঘটনাস্থলে পুলিশের মতো দেখতে দুজনকে দেখে তারা দৌড় দেন। এ সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ পালিয়ে যান। তবে ওই দুজন প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তারা ইউনিফর্ম পরা ছিলেন কি না কিংবা কোনো দায়িত্বে সেখানে ছিলেন কি না, তা যাচাই করছে তদন্ত সংস্থা।

অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, দীপ এর আগে বলেছিলেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং এরপর দুজন আলাদা পথে চলে যান। তাহলে রাত ২টার দিকে তারা কেন আবার ওই এলাকায় গিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেটি তাহসিফের কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলটির কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের সাঁতার জানা নিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাহসিফ সাঁতারের ওপর বিশেষ কোর্স করেছিলেন এবং এ বিষয়ে তার সনদও ছিল। ফলে ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়ে দীপের বক্তব্য তিনি বিশ্বাস করছেন না। তার আশঙ্কা, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হতে পারে।

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বলে জানান তার বাবা। গত ২৭ অক্টোবর রাতে বের হওয়ার পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তাহসিফ। তবে ওই বার্তার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। পরে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে বুধবার বিকেলে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। পিবিআই জানিয়েছে, তাহসিফ বাসা থেকে যে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজে সেটিতেও নম্বর প্লেট দেখা যায়নি।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। পিবিআই বলছে, পাওয়া প্রতিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে তাহসিফের পরিবার শুরু থেকেই এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছে এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।


অন্যান্য সংবাদ