যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে চলতি বছর হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০ ছাড়িয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে এ বছর পেনসিলভানিয়াতেই হামে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির বাসিন্দা। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অ্যামিশ জনগোষ্ঠীর বসবাস এই কাউন্টিতে। গত ৩৫ বছরের মধ্যে দেশটিতে দেখা দেয়া সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এলাকাটি। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদন এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা তুলে ধরে একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক সতর্ক করে বলেছেন, যারা হামের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের কারও নিরাপদ বোধ করার সুযোগ নেই। যারা টিকা নেননি কিংবা আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি, তাদের কেউই নিরাপদ নন।
দীর্ঘদিন ধরেই অ্যামিশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা গ্রহণের হার কম। সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও টিকা নেয়ার প্রবণতা কমছে। ফলে অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ ২০০০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
কমিউনিটির নেতাদের আশঙ্কা, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, হামে আক্রান্ত অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলে তাদের সংক্রমণের তথ্য সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অ্যামিশ ও রক্ষণশীল মেনোনাইট সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘প্লেইন কমিউনিটি’ বা অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রাদুর্ভাবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। তারা সাধারণ পোশাক পরেন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রাখেন। তবে এই জনগোষ্ঠীর সবার টিকা গ্রহণের হার কিংবা টিকা সম্পর্কে মনোভাব এক নয়।
সামগ্রিকভাবে সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের টিকা নেয়ার প্রবণতা কম। এর পেছনে ধর্মীয় বিধিনিষেধের চেয়ে সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের অভ্যাস বেশি দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এর আগে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসসহ কয়েকটি এলাকায় মেনোনাইট জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। চলতি বছরও দেশটির অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।
প্লেইন কমিউনিটির সদস্যরা সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সীমিত রাখলেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নন। কৃষিপণ্যের বাজার ও চিকিৎসকের চেম্বারসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ফলে তাদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়লে বৃহত্তর সমাজেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
কমিউনিটির নেতা ও গবেষকদের মতে, টিকা সম্পর্কে তাদের মনোভাব সময়ের সঙ্গে বদলেছে। কখনো টিকা গ্রহণের আগ্রহ বেড়েছে, আবার কখনো কমেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কঠোর জনস্বাস্থ্যবিধি আরোপের প্রতিক্রিয়ায় টিকা নেয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহ কমে যায়। তবে বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেকেই আবার টিকা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
এলিজাবেথটাউন কলেজের ইয়ং সেন্টার ফর অ্যানাব্যাপটিস্ট অ্যান্ড পিয়েটিস্ট স্টাডিজের পরিচালক স্টিভ নল্ট বলেন, অ্যামিশদের ধর্মতত্ত্ব বা ঐতিহাসিক কোনো নথিতে টিকার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অবস্থানের কথা নেই।
ওল্ড অর্ডার মেনোনাইট সম্প্রদায়ের সদস্য ও সাবেক চিকিৎসাকেন্দ্র প্রশাসক অ্যালেন হুভারের মতে, টিকা না নেয়ার পেছনে আদর্শিক বিরোধিতার চেয়ে দীর্ঘদিনের অভ্যাস বেশি কাজ করে। অনেকের ধারণা, আগে টিকা না নিয়েও তারা ভালো ছিলেন, তাই এখনো টিকার প্রয়োজন নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে দেশটির কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের ৯২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রয়োজনীয় এমএমআর টিকা নিয়েছে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এ হার ছিল ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ।
পেনসিলভানিয়ায় গত বছর শিশুদের এমএমআর টিকা গ্রহণের হার কমে ৯৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। কোনো এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি কম রাখতে সাধারণত ৯৫ শতাংশ টিকা গ্রহণের হার প্রয়োজন।
ফ্রাঙ্কলিন অ্যান্ড মার্শাল কলেজের গবেষক বারউড ইয়োস্ট বলেন, টিকা গ্রহণের হার কমে যাওয়ার প্রবণতা শুধু অ্যামিশদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২০ সালের পর থেকে মধ্য পেনসিলভানিয়ার প্রতিটি কাউন্টিতে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের টিকা গ্রহণের হার কমেছে।
এদিকে ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির কমিশনার অ্যালিস ইয়োডার বলেন, টিকা নিরাপদ ও কার্যকর, এই বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ১৯৯১ সালে পেনসিলভানিয়ায় হামের প্রাদুর্ভাবের সময় প্লেইন কমিউনিটির বহু মানুষ দল বেঁধে টিকা নিতে এসেছিলেন।
সেন্ট্রাল পেনসিলভানিয়া ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক ডি হলমস মর্টনও জানান, এবার টিকাদান কর্মসূচিতে আগের তুলনায় বেশি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা বাড়লে শুধু প্লেইন কমিউনিটি নয়, পুরো সমাজের সংক্রমণঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।