মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে এসব আদেশ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের মামলার রায় ঘোষণার পর ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা এবং সেই অর্থ ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিতরণের জন্য সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০(এ) ধারায় ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও তা আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। বিষয়টি সামনে আসার পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, আইনে ও রুলস অব প্রসিডিউরে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং জরিমানা করার বিধান রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। তবে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি বা অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা হয়নি।
তিনি বলেন, প্রচলিত ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ অথবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি ও জরিমানা আদায়ের বিধান রয়েছে। রায়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাপেক্ষে এসব আইন অনুসরণের কথা উল্লেখ থাকলে সরকারের পক্ষে আদেশ বাস্তবায়ন সহজ হবে।
শেখ হাসিনার মামলায় প্রথম ক্ষতিপূরণের রায়
সর্বপ্রথম ক্ষতিপূরণের রায় আসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে। রায়ে দেশে তাদের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হতাহতদের প্রাপ্য অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি মামলায় ক্ষতিপূরণের রায় আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চানখারপুলে হত্যাকাণ্ডের মামলা। এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, শেয়ারসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত অর্থ ছয়জন নিহতের পরিবারের মধ্যে সমানভাবে বিতরণের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
নিহত ছয়জন হলেন—শাহরিয়ার খান আনাস, শহীদ শেখ মাহাদী হাসান জুনায়েদ ওরফে মোস্তাকিন, শহীদ মো. ইয়াকুব, শহীদ রাকিব হাওলাদার, শহীদ মোহাম্মদ ইসমামুল হক এবং শহীদ মানিক মিয়া ওরফে শাহরিক। সরকার উপযুক্ত মনে করলে ঢাকা জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দিতে পারবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আক্তারুল ইসলাম।
আশুলিয়ার মামলায় সাইফুল ইসলামের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের দেশে থাকা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অপর আসামিদের মধ্যে সাতজনকে এক লাখ টাকা, একজনকে ৫০ হাজার টাকা এবং ছয়জনকে পাঁচ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে।
রায়ে আদালত বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ক্ষতিপূরণ স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগতভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বাজেয়াপ্তকরণ, সম্পত্তি উদ্ধার ও ক্ষতিপূরণ বিতরণসংক্রান্ত একটি প্রতিপালন প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের নির্ধারিত যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে দাখিল করতে হবে।
ওবায়দুল কাদেরসহ পাঁচজনের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
আদেশে বলা হয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হলো।
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের অথবা তাদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
হানিফসহ চারজনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
সবশেষে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চারজনের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্য তিনজন হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান।
এ মামলায় হানিফের মৃত্যুদণ্ড এবং অপর আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে সাজাপ্রাপ্ত সব আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায় হাতে পেলে সরকারকে চিঠি দেবে প্রসিকিউশন
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ওবায়দুল কাদের ও মাহবুব উল আলম হানিফের মামলার রায়ে ৫০ শতাংশ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সুস্পষ্ট আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর সম্পত্তিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করতে চিঠি দেওয়া হবে। বিক্রির অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হবে।