বাংলাদেশে বাড়ছে উগ্রবাদের তৎপরতা, কঠোর অবস্থানে সরকার
অনলাইন প্রচারণা, গোপন সংগঠন গঠনের চেষ্টা ও জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ; নজরদারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
বাংলাদেশে উগ্রবাদী তৎপরতা, জঙ্গিবাদী মতাদর্শের প্রচার এবং গোপনে নতুন সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উগ্রবাদী প্রচারণা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ মসজিদ থেকে সন্দেহভাজন জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে ২৩ জনকে আটক করার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে ‘ইতেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠন গঠনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি। বিষয়টি তদন্তাধীন।
অনলাইনেও নজরদারি বাড়ছে
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু মাঠপর্যায়ের তৎপরতা নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জামিনে থাকা উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য, পলাতক আসামি এবং অনলাইনে উগ্রবাদ ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের ওপর নজরদারি রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া উগ্রবাদী প্রচারণা মোকাবিলায় পাল্টা সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
এদিকে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু ও বোমা উদ্ধারের ঘটনাও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোপন সেল গঠনের সম্ভাব্য প্রচেষ্টার বিষয়ে সতর্কতার কথা উঠে এসেছে। তবে বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তারকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত নানা বিষয় জড়িত। তাই গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি তরুণদের সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি।
কঠোর অবস্থানের বার্তা সরকারের
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। উগ্রবাদী তৎপরতায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাও বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিস্তার সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয়। কোনো ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা মতাদর্শের সাধারণ মানুষকে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সব নাগরিকের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে ধর্মের নামে সহিংসতা, ঘৃণা ছড়ানো, জঙ্গিবাদী সংগঠন গঠন কিংবা নাশকতার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সামনে সরকারের বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদ দমনে শুধু কঠোর বক্তব্য বা গ্রেপ্তার অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, অর্থায়নের উৎস শনাক্ত, উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া তরুণদের পুনর্বাসন এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ নির্মূলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার, আইনের শাসন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখা। সরকার ঘোষিত কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে তদন্ত, বিচার ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।