ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলা বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সৌদি আরব। ইরানের মধ্যস্থতায় এই অর্থ হুথিদের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইসরায়েল হায়োম। তবে সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব বা কোনো অর্থ হস্তান্তরের কথা নিশ্চিত করেনি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই দাবি সামনে আসে।
ইসরায়েল হায়োমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের তেহরান সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের সঙ্গে সংঘাত বন্ধের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করা। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধের বিনিময়ে হুথিদের ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ শর্ত, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি কিংবা হুথিদের সম্মতির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি।
প্রতিবেদনে একজন কূটনৈতিক সূত্র দাবি করেছেন, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী একটি হারকিউলিস সামরিক পরিবহন বিমানে করে প্রস্তাবিত ১০০ কোটি ডলার তেহরানে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। একজন সৌদি কর্মকর্তাও অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
এর মধ্যে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ইরানের রাজধানী তেহরানে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন। বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিনও উপস্থিত ছিলেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংঘাত কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্যদেশগুলোর এই সফরের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা। পাশাপাশি কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে সরকারি বিবৃতিতে হুথিদের ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার কোনো প্রস্তাবের উল্লেখ নেই।
সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগের সমঝোতা বাস্তবায়ন। ইসরায়েল হায়োমকে দেওয়া বক্তব্যে একজন সৌদি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রায় তিন বছর আগে হওয়া সমঝোতা বাস্তবায়ন না হওয়াই বর্তমান সংঘাতের অন্যতম কারণ। ওই সমঝোতায় হুথিনিয়ন্ত্রিত এলাকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ এবং বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তার বিষয় ছিল।
হুথি গোষ্ঠীর অভিযোগ, সৌদি আরব আগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, সামরিক হামলার চাপের মুখে নতুন যুদ্ধবিরতিতে যেতে চায় না রিয়াদ। ফলে সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তা পুরোনো সমঝোতা বাস্তবায়নের অংশ, নাকি নতুন যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে আলাদা প্রস্তাব—সে বিষয়টিও স্পষ্ট নয়।
এদিকে সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, দেশটির পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং চারটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর আগের দিন হুথিরা সৌদি আরবের তেল পরিবহন অবকাঠামো ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা চালানোর দাবি করেছিল। তবে সব হামলার দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন নয়। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযানে নামে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের সংঘাত কমে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযানে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছে সংঘাত আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। তবে হুথিদের সঙ্গে নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে কিংবা অর্থের বিনিময়ে হামলা বন্ধের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
সব মিলিয়ে হুথিদের ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার খবর এখনো কূটনৈতিক সূত্রনির্ভর একটি দাবি। সৌদি আরব তেহরানে শান্তি আলোচনা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও প্রস্তাবিত অর্থের অঙ্ক কিংবা অর্থ হস্তান্তরের তথ্য নিশ্চিত করেনি। ফলে হুথিরা এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না এবং নতুন যুদ্ধবিরতি সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।