শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ০২:০৪ অপরাহ্ন

ডা. ঈশিতার বহু পরিচয়-অর্জন, যার সবই ভুয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : আগস্ট ১, ২০২১

ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৩ সালে (সেশন ২০০৫-২০০৬) এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দেন। তবে চার মাস চাকরি না করতেই শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন উচ্চাভিলাষী ইশরাত রফিক ঈশিতা। এরপরই শুরু হয় তার বহুমুখী প্রতারণা।

নিজেকে চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। এমপিএইচ, এমডি, ডিও’সহ নানা ভুয়া বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি ব্যবহার শুরু করেন। ভুয়া ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবেও বিভিন্ন মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের চিকিৎসা শাস্ত্রের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, আর্টিকেল বা থিসিস পেপারের ভুয়া প্রকাশনাও ব্যবহার করেন তিনি।

শুধু তাই নয়, তিনি নিজেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবেও পরিচয় দেন। করোনাকালেও থামেনি তার প্রতারণা। দুই দফায় ৬০ চিকিৎসককে তিনি সেমিনারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেন। শেষমেশ ধোপে টেকেনি তার বহুমুখী প্রতারণা। পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) হাতে রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রেফতার হন ভুয়া বিশেষজ্ঞ ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার ভুয়া প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া বহুমুখী প্রতারক ইশরাত রফিক ঈশিতা (আইপিসি)।

 

রোববার (১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, র‌্যাব সদরদফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৪ এর অভিযানে রোববার (১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিরপুর-১ থেকে ঈশিতা (৩৪) ও তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম ওরফে দিদারকে (২৯) গ্রেফতার করা হয়।

ঈশিতার বাবার নাম খন্দকার রফিকুল ইসলাম। ঢাকার কাফরুলে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। র‌্যাবের ওই অভিযানে ভুয়া আইডি কার্ড, ভুয়া ভিজিটিং কার্ড, ভুয়া সিল, ভুয়া সার্টিফিকেট, প্রত্যয়নপত্র, পাসপোর্ট, ল্যাপটপ, ৩০০ পিস ইয়াবা, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ ও মোবাইল উদ্ধার করা হয়।

 

গ্রেফতার দুই জনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে এবং গোয়েন্দা তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেফতার ইশরাত রফিক ঈশিতা পেশায় একজন চিকিৎসক। যিনি বিভিন্ন মাধ্যমে একজন আলোচক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, গবেষক, পিএইচডি সম্পন্ন, মানবাধিকার কর্মী, সংগঠক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদ মর্যাদার সামরিক কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বলে ভুয়া পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। ভুয়া পরিচয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে তিনি ভুয়া নথিপত্র তৈরি এবং প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ময়মনসিংহে অবস্থিত একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস শেষ করেন। ২০১৪ সালে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। চার মাস পর শৃঙ্খলাজনিত কারণে চাকরিচ্যুত হন তিনি।

গ্রেফতার হওয়া ঈশিতা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিদেশে সাফল্য ও স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে মিথ্যা প্রচার করতেন। তিনি প্রচার করেন, ২০২০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে হোটেল পার্ক অ্যাসেন্টে অনুষ্ঠিত জিআইএসআর ফাউন্ডেশনের দেওয়া ইন্টারন্যাশনাল ইন্সপাইরেশনাল উইমেন অ্যাওয়ার্ড (আইআইডব্লিউ ২০২০) পেয়েছেন, যা ৩৫ বছর বয়সী চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে ‘বছরের সেরা নারী বিজ্ঞানী’ হিসেবে পুরস্কার। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘রিসার্চ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ভারতের ‘টেস্ট জেম অ্যাওয়ার্ড ২০২০’, থাইল্যান্ডের ‘আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বলে প্রচার করতেন।

শুধু তাই নয়, তিনি প্রতারণার মাধ্যমে ভুয়া নথি উপস্থাপন করে ২০১৮ সালে জার্মানিতে ‘লিন্ডা ও নোবেল লরিয়েট মিট-মেডিসিনে’ অংশগ্রহণ করেন বলে প্রচার করতেন। আরও প্রচার করতেন তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এছাড়া তিনি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন যথাক্রমে- আমেরিকান সেক্সুয়াল হেলথ অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল সার্ভিকাল ক্যান্সার কোয়ালিশন এবং গ্লোবাল গুডউইল ইত্যাদির হয়ে বাংলাদেশে কাজ করছেন।

কিন্তু র‌্যাবের অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার এসব অ্যাওয়ার্ড ও অনুষ্ঠানে উপস্থিতির ছবি এডিটিং করে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে এবং ভার্চুয়ালি প্রচারণা চালানো হয়েছে।

ঈশিতা করোনা মহামারিকে পুঁজি করেও ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণায় সক্রিয় ছিলেন। আলোচক ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় তিনি অনলাইনে করোনা প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন ও সার্টিফিকেট প্রদান এবং প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। তিন-চার হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি দুই দফায় ৬০ চিকিৎসককে করোনা চিকিৎসার প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

 

আগ্রহীদের কাছে অর্থের বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করতেন ঈশিতা। তিনি ‘ইয়ং ওয়ার্ল্ড লিডারস ফর হিউমিনিটি’ নামক একটি অনিবন্ধনকৃত ও অননুমোদিত সংগঠন পরিচালনা করতেন প্রতারণার জন্য। অনলাইন প্লাটফর্মে যার ফেসবুক পেজ ও লিঙ্কডইন আইডি রয়েছে। সংস্থাটির সদরদফতর নিউইয়র্কে বলেও প্রচার করতেন। এই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতারণার নেটওয়ার্ক তৈরি করেন তিনি।

র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার মঈন বলেন, ২০১২ সালে একটি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা (ইঞ্জিনিয়ার) শেষ করেন দিদার। পরে তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমাও শেষ করেন। বর্তমানে একটি গার্মেন্টেসে কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। তিনিও ফিলিপাইনের একই সাইট থেকে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া মেজর জেনারেল পদ বাগিয়ে নেন। নিজেকে আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক), ইয়াং ওয়ার্ল্ড লিডার ফর হিউমিনিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের ফাউন্ডার (প্রতিষ্ঠাতা) বা কর্ণধার হিসেবে উপস্থাপন করেন। একইভাবে তিনি দুর্নীতিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দূত বা অ্যাম্বাসেডর হিসেবে পরিচয় দিতেন।

এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন বলেন, প্রতারক ঈশিতা ও দিদার যোগসাজশে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার ভুয়া সদস্য, কর্ণধার বা দূত হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অপরাধ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাদের আরও বেশ কয়েকজন সহযোগী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান ও গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য সংবাদ