রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

ইউপি নির্বাচন : উঠে যেতে পারে দলীয় প্রতীক

খালেদ মাহমুদ রকি
আপডেট : নভেম্বর ১৫, ২০২১

# নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচন ও পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব

# ৩ মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় নৌকার ভরাডুবি

# ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের হার বাড়ছে

স্থানীয় নির্বাচনকে আরও উৎমুখর পরিবেশে আনতে এবং স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে এলেও বাড়ছে দলীয় সংঘাত। স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় সংঘাতের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের হারও বাড়ছে। ফলে আগামীতে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক উঠে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।

দ্বিতীয় ধাপে ৮৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মধ্যে ৩৩০টিতেই জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। শতকরা হিসাবে তা প্রায় ৪০ শতাংশ। বিজয়ী স্বতন্ত্রদের মধ্যে সিংহভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

অবশ্য স্থানীয় এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় দলটির সমর্থিতদের বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, জয়ও পেয়েছেন কয়েকজন। এ ধাপে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীরা ৪৮৬টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন। শতকরা হিসাবে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৫৮ শতাংশ ইউপিতে জয়ী হয়েছেন দ্বিতীয় ধাপে। এ ধাপে ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় ধাপে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৯ ভোটারের মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৩ জন ভোট দিয়েছেন।

সে হিসাবে ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে প্রথম ধাপের তুলনায় দ্বিতীয় ধাপের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিজয়ী হার বেশি। প্রথম ধাপে ২১ জুনের ভোটে ২০৪টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৪৮ জন চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছিলেন। ২০ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ১৬০টি ইউপির মধ্যে নৌকার প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচিত হন ১১৯ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ২১ জুনের ভোটে ৪৯ জন এবং ২০ সেপ্টেম্বর জয় পান ৩৬ জন।

সব মিলিয়ে প্রথম ধাপে আওয়ামী লীগের ২৬৭ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ৮৫ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। হিসাবে প্রথম ধাপে ৭৩ ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয় পেয়েছিলেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ২৩ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদে।

এদিকে সিলেটে সদ্য সমাপ্ত দ্বিতীয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভরাডুবি হয়েছে। বিভাগের ৪৪ ইউনিয়নের একটিতে ভোট স্থগিত হলেও ৪৩টির ২৩ টিতেই হেরেছে নৌকা। ফলে বিভাগে অর্ধেকের বেশি চেয়ারম্যান পদ হাত ছাড়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটির। এরই মধ্যে তিন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার ২০টি ইউনিয়নের ১৪টিতেই দলীয় প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন।

এক্ষেত্রে ভোটারের কাছে গুরুত্ব পায়নি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের প্রতীক নৌকাও। দলীয় প্রতীক ছাড়াই এসব ইউপিতে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ভোটে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির রয়েছেন ১০ জন করে। জামায়াতে দুইজন ও খেলাফত মজলিসের একজন। দল মনোনীত প্রার্থীদের এমন বিপর্যয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যেমন তোলপাড় চলছে, তেমনি রক্তক্ষরণ হচ্ছে পরাজিত দলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের।

বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে নির্বাচন সচেতন মহলকেও। অর্ধেকেরও বেশি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীর হারের পর্যালোচনা শুরু হয়েছে, কারণ খুঁজছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ভরাডুবির কারণ খুঁজতে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মী, ভোটার, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং রাজনৈতিক সচেতন মহলের সঙ্গে কথা হয়। তাদের বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনে পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। কারণগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী না দেওয়া, বিদ্রোহ দমাতে ব্যর্থতা, নৌকার বিরোধিতায় বিএনপি এবং বিগত সময়ের অপেক্ষায় সুষ্ঠু ভোট হওয়া।

এই কারণগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতারা। তারা জানিয়েছেন, দলের প্রতি তৃণমূল নেতাকর্মীদের আনুগত্য না থাকায় এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণেই ফল বিপর্যয় হয়েছে। এছাড়া দলীয় সংঘাতের কারণেও ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে মনে করেন নেতারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা  বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের মধ্যে সংঘাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সুযোগে বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা সহজেই জয় পেয়ে যাচ্ছেন। এমনকি জামাতের প্রার্থীরাও বিজয়ী হয়েছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনা হচ্ছে। অনেক প্রবীণ নেতারা প্রস্তাব দিয়েছেন আগামীতে দলীয় প্রতীতে স্থানীয় নির্বাচন না দিতে।

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দলীয়ভাবে না করে আগের মতো নির্দলীয়ভাবে করার পক্ষে নিজের মতামত জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। একই সঙ্গে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে পৃথক একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

রোববার নির্বাচন ভবনের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের ডেকে এক লিখিত বক্তব্যে এ প্রস্তাব দেন মাহবুব তালুকদার। তিনি বলেন, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও সুদীর্ঘ ৫০ বছরে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়ন করা হয়নি। নির্বাচন প্রক্রিয়া সংস্কারের জন্য এই আইন প্রণয়ন অবধারিত হলেও তা যথেষ্ট নয়। এতে নিরপেক্ষভাবে সব রাজনৈতিক দলের স্বার্থ সংরক্ষণ করা আবশ্যক এবং তা সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। একপক্ষীয় আইন করে কোনো লাভ হবে না। তিনি বলেন, একপক্ষীয় আইন কেবল একদলীয় শাসনের পথ উন্মুক্ত করে। বিষয়টির যত তাড়াতাড়ি ফয়সালা হয় ততই মঙ্গল। নইলে দেশব্যাপী নৈরাজ্যের আশঙ্কা আছে।

তিনি বলেন, এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে রক্তাক্ত নির্বাচন বললে অত্যুক্তি হবে না। নির্বাচনের সময় ও তার আগে পরে এ পর্যন্ত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। জীবনের চেয়ে নির্বাচন বড় নয়, এই বার্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে সম্ভবত ব্যর্থ হয়েছি। গত ১১ নভেম্বর ৮৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৮০ জন চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। একে আক্ষরিক অর্থে নির্বাচন বলা যায় না। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সেখানে নির্বাচন নেই।

ইউপি নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে না হয়ে আগের মতো সবার জন্য উন্মুক্ত হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকবে না মন্তব করে মাহবুব তালুকদার বলেন, আমার মতে পৃথক একটি স্থানীয় নির্বাচন কর্তৃপক্ষ গঠন করে এসব নির্বাচন করা যায়। যে নির্বাচন প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশন ঠিক করে না, তার দায় কমিশন কেন নেবে? তবে এই পরিবর্তন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

তিনি আরও বলেন, সংকট সমাধানে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমি আবারও পুনরাবৃত্তি করে বলতে চাই, এই সংকট নিরসনে সব দলের সমঝোতা অপরিহার্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য সংবাদ