ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের ঘটনায় জিয়াউর রহমান নেতৃত্ব না দিলে বাংলাদেশ তার বর্তমান অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারত না বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেছেন, ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে ঘিরেই জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল।
তিনি ছিলেন একজন স্বাভাবিক নেতা। তার সততা, সাহসিকতা, নেতৃত্বগুণ ও জাতীয়তাবোধ তাকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ‘জাতীয় ঐক্য: ৭ নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বর নিয়ে অনেক ধরনের বর্ণনা রয়েছে। তবে ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে সংশ্লিষ্টদের বইপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে গবেষণা করা প্রয়োজন।
তিনি নিজের লেখা দুটি বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে সময় তিনি ৪৬ ব্রিগেডে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিলেন টু ফিল্ড আর্টিলারির সৈনিকরা। এ সময় ফোর বেঙ্গলের সৈনিকরাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। তাকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সিইওর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কর্নেল তাহেরের ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত বর্ণনাকে তিনি ভুল বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করেই সেনাবাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল। তিনি নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি; পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্বের জায়গায় চলে এসেছিলেন।
কর্নেল তাহের ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে বের হওয়ার পর জাসদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী গড়ে তোলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সরকারকে উৎখাত করা। ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে জিয়াউর রহমানকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, সেখানে গেলে জিয়াউর রহমানের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের বিভাজন দূর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন সেনাবাহিনীর সদস্যদের পোশাক, জুতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট ছিল। তিনি সেনাবাহিনীর কাঠামো ও সক্ষমতা পরিবর্তনের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এমনকি জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে আওয়ামী লীগকেও আলোচনায় ডেকেছিলেন।
সেমিনারে অধ্যাপক শাফিউল হক বলেন, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ১৪০০ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২০ হাজার মানুষের আহত, পঙ্গুত্ব ও নির্যাতনের বিনিময়ে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে হবে জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদ।
শাফিউল হক বলেন, সংবিধান সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এটি দেশের মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যেকোনো মূল্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও তা রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদকে সামনে রেখে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। দেশের কৃষক, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন।
সেমিনারে কি-নোট স্পিকার ছিলেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী।