মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের নির্দেশ, তা নিয়ে অস্বীকার, পাল্টা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে খবর প্রচার; সব মিলিয়ে রবিবার রাতভর তৈরি হয় নানা নাটকীয়তা। এর মধ্যে নিজের পদত্যাগের খবরকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন ইশরাক। এমনকি তার পদত্যাগের খবরকে ‘সম্পূর্ণ অসত্য’ বলে দাবি করে তার দফতর। কিন্তু রাত পেরিয়ে সোমবার সকালে এসে তার ফেসবুক পোস্টে দেখা গেলো ভিন্ন সুর। এবার তিনি নিজেই জানালেন, দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে ইশরাক হোসেন লেখেন, ‘আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবো এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবো, ইনশাআল্লাহ।’
পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সমালোচকদেরও জবাব দিয়েছেন। একইসঙ্গে জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে আরও জোরালোভাবে কাজ করবেন তিনি।
রবিবার দিনভর আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ইশরাক হোসেন। আগের দিন শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হাতে পিস্তল নিয়ে লোকজনকে তাড়া করার ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওতে তাকে অস্ত্র উঁচিয়ে লোকজনকে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স থাকলেই এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যায় কি না এবং একজন প্রতিমন্ত্রী নিজে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কিনা।
রবিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এর মধ্যেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে ডেকে নিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ খবর সামনে আসার পর রাতে ইশরাক বলেন, বিষয়টিকে গুজব হিসেবে ধরতে হবে। তার ভাষায়, ‘এর কোনও সত্যতা এখন পর্যন্ত নেই। এরকম যদি কোনও সিদ্ধান্ত আমরা দল থেকে নেই, তাহলে আপনাদের জানানো হবে।’
এর কিছুক্ষণের মধ্যে তার প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠান। এতে পদত্যাগের খবরকে ‘সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ইশরাককে পদত্যাগের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। পদত্যাগের প্রশ্নও ওঠে না।
বিভ্রান্তিকর খবর প্রত্যাহার না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
নাটকীয়তা আরও বাড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রচারের পর। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ খবর প্রচার করা হলেও পরে প্রতিমন্ত্রীর দফতর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তির পর পদত্যাগের নির্দেশের খবরের পরিবর্তে ইশরাকের বক্তব্য প্রচার করে বিটিভি। এতে পুরো ঘটনা নিয়ে জনমনে আরও ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকেও ছিলেন ইশরাক
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ইশরাককে ডেকে অসন্তোষ প্রকাশ এবং তাকে একটি খসড়া পদত্যাগপত্র দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি বলে জানান বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, ইশরাকের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।’ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের; এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।