বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম আগামী দুই বছরের মধ্যে আবারও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা। সরকারি ঋণের চাপ বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মার্কিন ডলারের আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা মূল্যবান এই ধাতুর চাহিদা বাড়াচ্ছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে।
তবে সম্প্রতি স্বর্ণের দামে কিছুটা পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে- এমন প্রত্যাশার মধ্যে বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৫ ডলারে নেমে আসে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
তা সত্ত্বেও তহবিল ব্যবস্থাপকেরা মনে করছেন, অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ আবারও বাড়বে। ফলে সাম্প্রতিক দরপতন কাটিয়ে মূল্যবান ধাতুটির দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ মাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রাথমিক হিসাবে ওই মাসে প্রায় ৬৩ টন স্বর্ণ কেনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্সে ৫ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি উঠে রেকর্ড গড়েছিল। পরে দাম কমলেও ঐতিহাসিক বিবেচনায় তা এখনো অনেক উঁচুতে রয়েছে।
ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক শার্লট ইয়ং বুধবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আয়োজিত প্রেশাস মেটালস সিম্পোজিয়ামে বলেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
ইয়ংয়ের মতে, সরকারি আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ঋণ, স্বর্ণের চাহিদা বাড়ানোর অন্যতম কারণ হতে পারে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থের জোগান বাড়াতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এতে বিভিন্ন মুদ্রার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে স্বর্ণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেই এর সরবরাহ বাড়াতে পারে না। ফলে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সম্পদের মূল্য ধরে রাখতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে বলে মনে করেন ইয়ং।
এওন ইনভেস্টমেন্টসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিনিয়োগপ্রধান পল কার্নও আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখছেন।
কার্নের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ডলারের ব্যবহার বিভিন্ন দেশকে মার্কিন মুদ্রার বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করতে পারে। সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইলে সোনা সেই বিকল্পগুলোর একটি হিসেবে বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্ববাজারে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের আশঙ্কাও সোনায় বিনিয়োগের পক্ষে যুক্তি জোরালো করছে। খনি কোম্পানি অ্যালাইড গোল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী পিটার ম্যারোনে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বৈশ্বিক বাজার বড় ধরনের আর্থিক অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে কি না, বিনিয়োগকারীদের তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
তার ভাষ্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বা ফ্যামিলি অফিস স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ কমিয়ে সোনায় অর্থ রাখার প্রবণতা দেখাচ্ছে।
স্বর্ণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এন্ডেভার মাইনিংয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ককরিলও কাগুজে মুদ্রার ভবিষ্যৎ, সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা এবং মজুত সম্পদের মূল্য ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রচেষ্টাকে স্বর্ণের দাম বাড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ককরিলের ধারণা, স্বর্ণের পরবর্তী বড় উত্থানের আগে প্রতি ট্রয় আউন্সের দাম ৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি একটি নিম্নসীমা তৈরি করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই মূল্যস্তর যে অবশ্যই ধরে রাখা যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
স্বর্ণের বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
চীনও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্বর্ণের মজুত বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের উদ্ধৃত বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার কাছে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৪১০ টন সোনা রয়েছে। দেশটির মোট রিজার্ভের প্রায় ৯ শতাংশ এই স্বর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারাবাহিক কেনাকাটা, সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ ও ডলারের বিকল্প হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বৃদ্ধি- এই তিনটি বিষয় আগামী দিনে মূল্যবান ধাতুটির বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সুদের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়া ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে দাম ওঠানামার ঝুঁকিও থাকছে। তাই নতুন রেকর্ডের পূর্বাভাস থাকলেও স্বর্ণের দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সূত্র: লাইভ মিন্ট