প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র জাপানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে আধিপত্য চীন ও ভিয়েতনামের। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশও এ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। তবে প্রতিযোগিতার এই বাজারে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন ডলারে।
এই ঘাটতি কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএর সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এজন্য পণ্যের বৈচিত্র্য, গুণগত মান, কমপ্লায়েন্স ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাপানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি কাজে লাগানোর তাগিদও দিচ্ছেন তারা।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে ঘিরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ বাস্তবায়নে যৌথ কর্মপরিকল্পনা ও সহযোগিতা চাইবে ঢাকা। পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) পরিচালক অধ্যাপক ড. এস কে তৌফিক এম হক বলেন, গবেষণার মাধ্যমে জাপানের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ অবকাঠামো ও তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগের পাশাপাশি তাদের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম বলেন, জাপানের বাজারে ফ্রোজেন ফুডসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি বাড়াতে হলে দেশটির নির্ধারিত মান বজায় রাখা জরুরি। পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সার্টিফিকেশন-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ করতে পারলেই জাপানের বাজারে প্রবেশ ও সফলভাবে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানে রপ্তানি বাড়াতে প্রচলিত পণ্যের বাইরে নতুন পণ্যের বাজার তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে গুণগত মান, কঠোর কমপ্লায়েন্স, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। জাপানের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেও দেশটির বাজারে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এগিয়ে থাকতে পারেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করে সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে দেশটির বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল গড়ে উঠতে পারে। চীন থেকে জাপানের বিনিয়োগ অন্যত্র সরে আসার যে প্রবণতা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশও সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে।
শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, শিল্প ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও জাপানের সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায় বাংলাদেশ। বিশ্লেষকদের মতে, ইপিএর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে চুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান ও বাজারের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।