বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আগামী কয়েক মাসে আরও বাড়তে পারে এবং ২০২৭ সালজুড়েও এর প্রভাব অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট খরার কারণে শস্যের সরবরাহ কমে আসায় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। সোমবার (১৯ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার কেন্দ্রীয় এলাকায় ৬৩ বছর বয়সী পার্কিং সহকারী মুহাম্মদ ইয়াসিন রয়টার্সকে জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি খাবার খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ইয়াসিন বলেন, আগে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার রুপিয়ায় (০.৩৯ থেকে ০.৪৪ ডলার) চাল, টেম্পে ও টোফু কিনতে পারতাম। এখন সেগুলোর দাম ১৫ হাজার রুপিয়া।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, এসব কারণে পুরো ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো আগামী বছরজুড়েই এর প্রভাব আরও বেশি দেখা যাবে।
খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ায় বিশ্বের দরিদ্রতম ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে খাদ্যের দাম বাড়ছে। এসব অঞ্চলে পরিবারের মোট ব্যয়ের বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে খরচ হয়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির বিশ্লেষণ করা ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন হওয়া বিভিন্ন পণ্যের মাসিক মূল্যপরিবর্তন পরিমাপকারী এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টিপাত দেরিতে হওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যে চালের দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মিসরে রুটির দাম এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারতে চিনির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। একই সময়ে লোহিত সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল করতে হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানি ব্যাহত করেছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে, এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারতে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
২০২৬ সালে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর সারের দাম কিছুটা কমেছে, তবে এখনো তা তুলনামূলক বেশি।
নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি, এখন বাস্তবতা।’ পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালের বাড়তি ব্যয়ের কারণে পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় আকারের একেকটি রুটির দাম জুলাই মাসের চার মিসরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেপ্টেম্বরে এক মাসের ব্যবধানে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
কায়রোর কেন্দ্রস্থলের বেকারি ব্যবসায়ী সায়েদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ বলেন, শুধু ময়দার দামই বাড়েনি। তিনি বলেন, দক্ষ কর্মী নিয়োগ করতে গেলেও অনেক খরচ হয়। বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট এবং ভোক্তাদের জন্য রুটি তৈরি করতে ব্যবহৃত সব উপকরণের দামই বেড়েছে।
তেলের দাম এবং যুদ্ধজনিত বাড়তি মাশুল বৃদ্ধির কারণে কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নৌপথে ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বাড়তি দাম ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যেসব বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফসল উৎপাদনের কারণে এত দিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়ে রেখেছিল, তাদের এখন আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হচ্ছে। এতে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকেরা আবার বাজারে ফিরলে চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত থেকে পাওয়া সুরক্ষা ক্রমেই কমে আসছে। তিনি বলেন, আগের মৌসুমগুলোর ভালো ফলন ও মজুত আমাদের একটি সুরক্ষাবলয় দিয়েছিল। কিন্তু সেই সুরক্ষাবলয়ের ওপর এখন চাপ বাড়ছে। এর অর্থ, পণ্যের দাম আরও জোরালোভাবে বাড়তে পারে।
সাধারণত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। এখন এসব চুক্তি নবায়নের সময় তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রার দুর্বলতা যুক্ত হয়ে আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকাস ওয়েলিরাং বলেন, পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। রুপিয়ায় হিসাব করলে ইন্দোনেশীয় মুদ্রার দুর্বলতার কারণে এর প্রভাব আরও বেড়ে যায়।
দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহেও সমস্যায় পড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
জাকার্তাভিত্তিক একটি ময়দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বেশ কয়েকটি গমকল তাদের উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করছে। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই নির্বাহী নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
কে-প্লারের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় সেপ্টেম্বরে গমের চালান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে সয়াবিন ও ভুট্টার মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এসব পণ্যের সরবরাহ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জৈব জ্বালানি তৈরিতে এসব শস্যের ব্যবহার বাড়ছে, যা দাম বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের অর্থনীতিবিদ কারাভাইতসেভের মতে, দক্ষিণ গোলার্ধে গমের অনুকূল ফলন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো রপ্তানিকারক দেশে উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে তা বাজারে দাম বাড়ার নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, দাম আরও বাড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।