যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) কর্মসূচি-২০২৭-এর নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশটির ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালত সময়সূচি নির্ধারণ ও আবেদন গ্রহণের বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। গত ১৪ অক্টোবর দেওয়া এ আদেশের ফলে কর্মসূচিটির নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আদালতের নির্দেশের বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের আবেদনের যোগ্যতা-দুটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ফোর্বসের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন শুরুর কথা থাকলেও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা পিছিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর মন্ত্রণালয় জানায়, নিবন্ধনের তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে। তবে আদালতের আদেশে নিবন্ধনসংক্রান্ত কী কী বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে কর্মসূচিটি নির্ধারিত সময়েই চালু হবে বলে বলা যাচ্ছে না।
ডিভি কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক কম অভিবাসী পাঠায়-এমন দেশগুলোর যোগ্য নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ভিসার জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে কর্মসূচিটির আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। এতে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ভিসা দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ সংখ্যার মধ্যে নির্বাচিত মূল আবেদনকারীদের পাশাপাশি তাঁদের যোগ্য স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
লটারিতে নির্বাচিত হওয়া মানেই গ্রিন কার্ড পাওয়া নিশ্চিত নয়। নির্বাচিত ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিসার আবেদন সম্পন্ন করতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা ও অন্যান্য অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রধান আবেদনকারীর সাধারণত অন্তত উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা থাকতে হয়। বিকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী কর্ম-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও যোগ্যতা অর্জন করা যায়। এ কর্মসূচিতে আবেদনের জন্য সাধারণত মার্কিন নিয়োগকর্তার চাকরির প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়।
বাংলাদেশিদের সুযোগ এখনো নিশ্চিত নয়
ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন নিয়ে আদালতের নির্দেশ থাকলেও বাংলাদেশিরা আবেদন করতে পারবেন কি না, তা আলাদা বিষয়। ডিভি কর্মসূচিতে দেশের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনসংক্রান্ত পরিসংখ্যান ও নির্দিষ্ট নিয়ম বিবেচনা করা হয়। তাই নিবন্ধনপ্রক্রিয়া চালু হওয়ার নির্দেশকে বাংলাদেশিদের জন্য আবেদন করার সুযোগ ফিরে আসার ঘোষণা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, আগের পাঁচ বছরে কোনো দেশ থেকে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে গেলে সেই দেশের নাগরিকেরা ডিভি কর্মসূচির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন। তবে কোন দেশ কোন বছরের কর্মসূচিতে যোগ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট বছরের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা ও তালিকা থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ডিভি কর্মসূচির অযোগ্য দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশিরা সর্বশেষ ২০১২ সালের দিকে এ কর্মসূচিতে আবেদন করার সুযোগ পেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ডিভি-২০২৭-এ বাংলাদেশের অবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বছরের আনুষ্ঠানিক যোগ্যতার তালিকা প্রয়োজন।
তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের দাবি
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিলের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দপ্তরটির ১০ আগস্ট প্রকাশিত এক হালনাগাদ তথ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিলের কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভিসা বাতিলের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে ভিসা বাতিলের মোট সংখ্যার মধ্যে কোন ধরনের ভিসা অন্তর্ভুক্ত, কী কারণে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে এবং কোন সময় পর্যন্ত হিসাব করা হয়েছে-এসব তথ্য স্পষ্ট না হলে পরিসংখ্যানটির পূর্ণ তাৎপর্য নির্ধারণ করা কঠিন।
অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগ নিয়ে অধিকারকর্মীদেরও উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, কিছু ক্ষেত্রে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও বাক্স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তবে এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি ও নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, আদালতের নির্দেশ ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করলেও কর্মসূচিটি কবে চালু হবে এবং বাংলাদেশিরা আবেদন করতে পারবেন কি না—তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং আদালতের আদেশের পূর্ণ বিবরণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি হবে।