ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া এবং ফেসবুকে ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলায় নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরির দায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে। গত ২১ অক্টোবর বিচারক ফ্রান্সিস জে. ম্যাথিউ এ আদেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এটি অন্যতম বৃহৎ আর্থিক দণ্ড। তবে মেটা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মামলাটির সূত্রপাত ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহারের ঘটনায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা তৃতীয় পক্ষের একটি অ্যাপের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব তথ্য ব্যবহারকারীদের সম্মতি ছাড়াই রাজনৈতিক প্রচারের কাজে ব্যবহার করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ফেসবুকের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর জেরেই ২০২১ সালে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে।
মামলায় নিউ মেক্সিকোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং সেই তথ্য কারা ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। গত সেপ্টেম্বরে বিচারকদের নয়, বরং বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া জুরিরা মেটার বিরুদ্ধে রায় দেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৫টি ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য বা আচরণ করেছে। প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার জরিমানার বিধান রয়েছে।
জুরির রায়ের পর জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করেন বিচারক ম্যাথিউ। আইন অনুযায়ী প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ জরিমানা হিসাব করলে মোট অর্থের পরিমাণ ২১৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি দাঁড়াত। তবে আদালত সেই অঙ্ক কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেন। বিচারকের আদেশে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বছরে ১৫ শতাংশ হারে সুদ যোগ হওয়ার কথাও রয়েছে। ফলে আপিলের মাধ্যমে রায় পরিবর্তন না হলে মেটার আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।
মেটার প্রধান আইন কর্মকর্তা সি জে মাহোনি এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই জরিমানা নিউ মেক্সিকোতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, মামলাটির মাধ্যমে অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবে, তা নিয়ন্ত্রণের নতুন নিয়ম কার্যকর করার চেষ্টা হচ্ছে। মেটা আপিলে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজের দপ্তর এই রায়কে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
মেটার বিরুদ্ধে এটিই একমাত্র বড় মামলা নয়। চলতি বছরের আগস্টে শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা পৃথক মামলার নিষ্পত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিউ মেক্সিকোতেই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পৃথক মামলায় মেটার বিরুদ্ধে আর্থিক দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২৫ বিলিয়ন ডলারের রায় কার্যকর থাকবে কি না, তা এখন আপিল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। সূত্র: নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের বিচার বিভাগ, রয়টার্স, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।